ইংরেজদের সাথে
তিতুমীরের সংঘর্ষের কারণ কী ছিলো ?
মুসলমানদের দ্বারা লিখিত এবং মুসলমান প্রভাবিত, উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া, আপনাকে এই ব্যাপারে, অনেক মিথ্যার সাথে এই ইতিহাস ই শেখাবে যে, মুসলমান প্রজাদের উপর হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিতুমীর ইংরেজদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে এবং ইংরেজরা তাকে হত্যা করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য কি তাই ?
তিতুমীরকে
মহানায়ক করে তুলতে, মুসলমান ইতিহাস
রচয়িতাদের প্রধান অস্ত্র হলো মুসলমান প্রজাদের উপর হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার এবং
তাদের উপর আরোপিত অবৈধ কর। কিন্তু এই অবৈধ করের রূপ ও প্রকৃতি ছিলো কী, সেই ব্যাখ্যা কোনো মুসলমান ঠিকভাবে
দেবে না এবং এই অবৈধ কর কি জিজিয়া করের চেয়েও মারাত্মক ছিলো ? এ ব্যাপারেও কোনো মুসলমান মুখ খুলবে
না।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যে বা যারা যখন ক্ষমতা হাতে পায়, তখন সে বা তারা কিছুটা স্বেচ্ছাচারী বা অত্যাচারী হয়ে উঠে। কিন্তু ভারতে হাজার বছরের মুসলমানদের যে দুঃশাসন, তার ১% ও কি কোনো হিন্দু জমিদার, কোনো মুসলমানের উপর করেছে ? এমন কোনো প্রামান্য দলিল কি মুসলমানদের কাছে আছে ?
কর নিয়েই যখন কথা উঠেছে, তখন করের প্রসঙ্গটা আগে শেষ করা করি :
ইসলামে জিজিয়া
কর বলে একটা কথা আছে। ইসলামের নবী মুহম্মদের জিহাদী তত্ত্ব দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে
যখন মুসলমানরা কোনো অমুসলিম দেশ বা এলাকা দখল করেছে, তখন প্রাথমিক অবস্থায় কিছু সংখ্যক সক্ষম পুরুষদের হত্যার
পর তাদের ধন-সম্পদ ও নারী শুধু লুঠই নয়, পরেও যেন অমুসলিমদের টাকায় আরাম আয়েশে মুসলমানরা বসে বসে
খেতে পারে, সেজন্য বাকি
অমুসলিমদের উপর এক ধরনের কর বসিয়েছে, এরই নাম জিজিয়া কর। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে দেখে নিন
নিচের হাদিসটি –
“আল্লাহর রসুল আবু উবাইদা বিন আল জাহেরাকে বাহরাইনে পাঠালেন জিজিয়া সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে, আর রসুল বাহরাইনের লোকদের সাথে একটা চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন ও আল আলা বিন আল হাদরামি কে তাদের শাসক নিয়োগ করেছিলেন। যখন ফজরের নামাজের সময় আনসার (মদীনার) লোকজন নবীর সাথে ছিল ঠিক সে সময়ে আবু উবাইদা বাহরাইন থেকে জিজিয়া কর নিয়ে সেখানে ফিরে আসল। নবীর সাথে নামাজ আদায় করার পরেই তারা সবাই নবীর নিকট জড় হলো, নবী তাদের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে বললেন, আমি অনুভব করছি উবাইদা কিছু এনেছে আর তার গন্ধ তোমরা পেয়েছ। সবাই সমস্বরে বলে উঠল, হ্যা রাসুলুল্লাহ। তিনি বললেন, আনন্দ কর আর আশা কর যা তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করবে। আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের দারিদ্র নিয়ে ভীত নই। (বুখারী, ভলুম-৪, বই-৫৩, হাদিস-৩৮৫)
এখানে মুহম্মদ, মুসলমানদের দরিদ্র নিয়ে ভীত এজন্যই নয়
যে সে অমুসলিমদের কাছ থেকে জিজিয়া কর নিয়ে তা মুসলমানদেরকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে।
এর আগে
মুসলমানরা কীরকম গরীব ছিলো এবং কেনো তারা জিহাদ করতে গিয়ে মরতে ও মারতে এত উৎসাহী, সেটা দেখে নিন, নিচের এই হাদিসে-
মুসলমানরা পারস্যে যুদ্ধ করতে গেলে পারস্যের একজন জিজ্ঞেস করে তোমরা কারা ? এর জবাবে মুগিরা উত্তর দেয় – “আমরা আরব দেশের লোকজন, আমরা একটা খুব কঠিন, দুর্বিষহ ও দুর্যোগময় জীবন যাপন করতাম, শুকনা খেজুর খেয়ে আমরা ক্ষুধা নিবারন করতাম, উট ও ছাগলের লোমের তৈরী কাপড় দিয়ে বস্ত্র বানাতাম, ও গাছ ও পাথরের পুজা করতাম। এরকম অবস্থার মধ্যে যখন আমরা ছিলাম, আসমান ও জমীনের প্রভু আমাদের মধ্যে একজন নবী পাঠালেন যার পিতা মাতাকে আমরা চিনতাম। আমাদের নবী আমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন তোমাদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করতে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর উপাসনা করবে অথবা জিজিয়া কর প্রদান করবে। আমাদের নবী অবগত করেছেন যে, আমাদের প্রভু বলেছেন, যেই যুদ্ধে আমাদের মধ্যে মারা যাবে সে বেহেস্তে প্রবেশ করবে ও জাকজমক পূর্ণ জীবন যাপন করবে যা সে কখনো দেখেনি, আর যে বেঁচে থাকবে সে তোমাদের প্রভু হবে। ( বুখারি, ভলুম-৪, বই-৫৩, হাদিস-৩৮৬)
মুসলমানরা জিজিয়া করের উপর কী পরিমান নির্ভরশীল ছিলো, সেটা দেখে নিন নিচের এই হাদিসে-
“জুরাইয়া বিন কাদামা আত তামিমি বর্ণিত, হে বিশ্বাসীদের নেতা ! আমাদেরকে উপদেশ দান করুন। তখন ওমর বললেন, “ জিম্মীদের সাথে আমাদের ব্যবস্থা পূর্ণ কর । কারণ, এ ব্যবস্থা তোমাদের রসুলের পক্ষ থেকে আর এ ব্যবস্থা হলো (অমুসলিমদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায়) তোমাদের ওপর নির্ভরশীলদের জন্য জীবিকার উপায়।" ( সহি বুখারী, ভলুম-৪, বই-৫৩, হাদিস-৩৮৮)
ইতিহাস রচয়িতার মুখে, এবার দেখুন ভারতে এই জিজিয়া করের রূপ কী ছিলো ?
"তারিখ-ই-ফিরোজশাহী" গ্রন্থে, প্রত্যক্ষদর্শী জিয়াউদ্দিন বারণী লিখেছেন , "একদিন মুঘিসুদ্দিন নামে এক কাজী, সুলতান আলাউদ্দীন খিলজির রাজ সভায় আসে। সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করে, জিজিয়া প্রদানকারী এবং বশ্যতার নিদর্শন স্বরূপ কর প্রদানকারী হিন্দুদের সঙ্গে, ইসলামি শাস্ত্র, মুসলমানদের কী রকম ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয় ?
জবাবে কাজী মুঘিসুদ্দিন বলে, " তারা হলো জিজিয়া প্রদানকারী জিম্মি। জিজিয়া আদায়কারী মুসলমান কর্মচারী তাদের কাছে রৌপ্যমুদ্রা দাবী করলে তাদের উচিত হবে সসম্মানে ও বিনয়ের সাথে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা। সেই কর আদায়কারী যদি রেগে গিয়ে তাদের দিকে নোংরা বা ধুলা ছুড়ে মারে, তবে তাদের উচিত হবে তা হা করে গিলে ফেলা। এইভাবেই তারা সেই কর আদায়কারীকে সম্মান দেখাবে। এইভাবে বিনয়ের সাথে কর দিয়ে এবং বিনা প্রতিবাদে নোংরা গিলে তারা বশ্যতার প্রমান দেবে এবং এর মধ্য দিয়েই ইসলামের গৌরব ও হিন্দুধর্মের হীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বয়ং আল্লা তাদের ঘৃণা করেন এবং বলেন, "তাদের সর্বদা পরাধীন করে রাখো্।" হিন্দুদের সর্বদা হীন করে রাখাই আমাদের ধর্মীয় কর্তব্য। কারণ, তারা আল্লার রাসূলের চিরস্থায়ী শত্রু। তাছাড়া আল্লার রাসূল আমাদের নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন,
"তাদের হত্যা
করো, লুণ্ঠন করো এবং
তাদেরকে ক্রীতদাসে পরিণত করো।"
তিনি আরও বলে গিয়েছেন,
"তাদের হত্যা করো অথবা ধর্মান্তরিত করো, তাদের যথাসর্বস্ব লুঠ করো এবং দাসত্ব করতে বাধ্য করো।"
ইসলামের মহান টিকাকার হানিফার মত হলো, "হিন্দুদের উপর জিজিয়া চাপিয়ে দাও"- এবং আমরা সেই মহান হানিফাকেই অনুসরণ করি। অন্যান্য টিকাকারদের মতে, হিন্দুদের সামনে দুটো রাস্তা; হয় ইসলাম গ্রহন অথবা মৃত্যু।"
এই রকম অমানবিক জিজিয়া করের প্রবর্তক এবং আদায়কারীরা, তিতূমীরকে হিরো বানাতে গিয়ে, হিন্দু জমিদারদেরকে ভিলেন বানিয়েছে মুসলমান প্রজাদের উপর অবৈধ কর চাপানোর মিথ্যা গল্প ফেঁদে, অপচেষ্টা টা মন্দ নয়।
এখন দেখা যাক ভারতে জিজিয়া করের বাস্তব প্রয়োগ এবং তার কুফল কী ছিলো ? জিজিয়া করের আর্থিক চাপে পড়ে যারা মুসলমান হয়ে যেতো, তারা এই কর দেওয়া থেকে রেহাই পেতো এবং এই কর কোনো সাধারণ কর ছিলো না, ছিলো সম্পূর্ণ অমানবিক এক কর, যা শুধুমাত্র অমুসলিমদের উপর ধার্য ছিলো। মুহম্মদ কর্তৃক প্রবর্তিত এই করের মূল কথা ছিলো, মুসলমানদের দেশে অমুসলিমদেরকে বাস করতে হলে এই কর তাদেরকে দিতে হবে, না হলে মুসলমানরা তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করবে বা হত্যা করবে। এক শ্রেণির অমানুষ, উন্মাদ ও বর্বররা হাতে তুলে নিয়েছিলো তলোয়ার, তাদের হুকুম না শুনে কি কারো উপায় ছিলো ? সুতরাং জীবন রক্ষা করতে এবং সম্পদের সামান্য নিরাপত্তার জন্য হিন্দুদেরকে জিজিয়া কর স্বীকার করে নিতেই হয়েছিলো। এই জিজিয়া করের প্রকৃতি এবং কর দাতাদের অবস্থা কেমন ছিলো, সেটা দেখে নিন নিচে:
ভারতের সবচেয়ে গরীব হিন্দু পরিবারকে কর দিতে হতো, তার পরিবারে এক বছর যতো খাদ্য শস্য লাগতো, সেই পরিমান। অর্থাৎ একজন হিন্দু সারাদিনে যে পরিমান খাবার খেতো, ঠিক সেই পরিমান কর মুসলমান শাসকদেরকে দিতে হতো তার জীবন ও ধর্ম রক্ষা করার জন্য। এটা ছিলো সর্বনিম্ন কর। এর বাইরে যারা ছিলো যত ধনী, তাদের উপর জিজিয়া কর ছিলো তত বেশি। কিন্তু হিন্দুরা যতই ধনী হোক, শেষ পর্যন্ত কেউ আর ধনী থাকে নি। একদম গরীব হিন্দুরা জিজিয়া করের অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়ে শুরুতেই হয় মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো, না হয় জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলো। আর তুলনামূলক ধনী হিন্দুরাও শেষ পর্যন্ত কয়েক বছরের মধ্যে ভিখারী হয়ে মুসলমানদের দ্বারে দ্বারে কেউ ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলো, আর কেউ জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলো। একটু বড় হলেই মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া, যার ফলে বাল্য বিয়ের উৎপত্তি, বাড়ীর বউদের যখন তখন এসে ধর্ষণ করা করা, উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, যার ফলে হিন্দু বউদের ঘোমটা দেওয়ার নিয়ম এবং অসূর্যস্পর্শ্যা প্রথার উদ্ভব, যে প্রথায় মেয়েদের গায়ে সূর্যের আলোও লাগতো না, অর্থাৎ জন্মের পর থেকেই সব সময় মুসলমানদের ভয়ে ঘরে থাকতো বন্দী - সেসব অত্যাচার নির্যাতনের কথা এখানে আর উল্লেখ না হয়, না ই করলাম ।
মুসলমানদের এই সব অত্যাচার অনাচারের বিপরীতে, ইংরেজদের ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে হিন্দুরা কি মুসলমানদের উপর সেরকম কোনো প্রতিশোধ নিয়েছে ? হিন্দু জমিদার কর্তৃক মুসলমানদের উপর অবৈধ কর আরোপের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা একটা অপবাদ, যেটা এই পোস্টের আরো কিছু পরে গিয়ে বুঝতে পারবেন। তাহলে হিন্দু জমিদারদের সাথে তিতুমীরের সংঘর্ষের সূত্রপাত হলো কিভাবে ?
এবার তিতুমীরের জীবনীর দিকে একটু তাকানো যাক। তিতুমীরের জন্ম ১৭৮২ সালে, ১৮২২ সালে সে হজ করতে মক্কায় যায়। এই ৪০ বছরে তার জীবনের উল্লেখ যোগ্য কোনো ঘটনা নেই, কিন্তু এটাই মানুষের যৌবনকাল, বিদ্রোহের কাল। হিন্দু জমিদাররা যদি মুসলমানদের উপর এতই অত্যাচার নিপীড়ন করতো, তাহলে তিতুমীর এই সময় চুপ ছিলো কেনো ?
হজে গিয়ে তিতুমীর, গোঁড়া ইসলামী নেতা "সাইয়িদ আহমদ বেরেলীর " সান্নিধ্য লাভ করে। সাইয়িদ আহমদ তাঁকে বাংলার মুসলমানদের অনৈসলামিক রীতিনীতির অনুশীলন এবং বিদেশি শক্তির পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করে। ১৮২৭ সালে মক্কা থেকে দেশে ফিরে তিতুমীর চবিবশ পরগনা ও নদীয়া জেলায় মুসলমানদের মধ্যে ইসলামি অনুশাসন প্রচার শুরু করে। কারণ সেই সময় মুসমানদের পোষাক ছিলো হিন্দুদের মতো, সবাই পড়তো ধুতি, নামও ছিলো হিন্দুদের মতো। মুসলমানরা পীর দরগার ভক্ত ছিলো। তিতুমীর, সাইয়িদ আহমদ বেরেলীর নির্দেশ অনুযায়ী, মুসলমানদের এই সব শিরক ও বিদআত অনুশীলন থেকে বিরত থেকে ইসলামের অনুশাসন মোতাবেক জীবনযাত্রা পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে এবং ক্ষেত্র বিশেষে নির্দেশও দেয়। তারা, মুসলমানদেরকে আরবি নাম রাখতে এবং আরবদের মতো জোব্বা-টুপি-দাড়ি রাখতে বাধ্য করে। অথচ মুসলিম ইতিহাস রচয়িতারা লিখেছে, এই দাড়ি রাখার জন্যই নাকি হিন্দু জমিদাররা মুসলমানদের উপর কর ধার্য্য করে, মিথ্যাচার আর কাকে বলে ?
তিতুমীর ছিলো সুন্নী ওয়াহাবী আন্দোলনের সমর্থক। এরা পীর-দরগায় শ্রদ্ধা ভক্তি দেখানোকে শিরক বিদআত মনে করে। তাই তারাগানিয়া গ্রামে একবার শিয়াদের মহররম অনুষ্ঠানে তারা বাধা দেয় এবং দরগায় লাথি মারে। স্থানীয় মুসলমানরা এই ঘটনার বিচার দেয় জমিদারের কাছে।এই ভাবে শুরু হয় জমিদারের সঙ্গে তিতুমিরের বিবাদ এবং আস্তে আস্তে তা পরিণত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। এই সংঘর্ষ থামাতেই হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয় ইংরেজ সরকার। মামলা হয় তিতুমীর ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। ফলে হিন্দু জমিদার তথা হিন্দুদের সাথে সাথে ইংরেজরাও তিতুমীরের শত্রু হয়ে যায়।
প্রথমে তারাগোনিয়ার জমিদার রাজনারায়ণের সাথে তিতুমীরের সংঘর্ষ বাঁধে। এরপর এই জমিদারের সাহায্যে- পুরার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়, গোবরডাঙার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, , নাগপুরের জমিদার গৌরীপ্রসাদ চৌধুরী এবং গোবরা-গোবিন্দপুরের জমিদার দেবনাথ রায়- এগিয়ে এলে তাদের সাথেও তিতুমীর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এই সংঘর্ষ
চলাকালীন তিতুমীরের শখ হয় নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করার। কিন্তু বাদশাহর তো একটা দুর্গ
বা প্রাসাদ থাকা চাই। তাই তিতুমীরের অনুসারীরা নারিকেল বাড়িয়ায় তৈজমুদ্দিন
বিশ্বাসের জমির উপর বাঁশ-কাদা দিয়ে এক দু্র্গ নির্মানের চেষ্টা করে, যেটা পরে মুসলমানদের ইতিহাসে পরিচিতি পায়
বাঁশের কেল্লা নামে। এই কেল্লা তৈরি হওয়ার পর তিতুমীর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিশাল এলাকাকে
ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন ঘোষণা করে নিজেকে বাদশা ঘোষণা করে এবং জমিদার ও ইংরেজদের
বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে।
তিতুমীরের যেদিন এই জিহাদের ডাক দেয়, সেদিনই তার অনুসারীরা "পুঁড়ার বাজার" আক্রমণ করে মহেশ চন্দ্র ঘোষের একটা গরু ছিনিয়ে নিয়ে সেটি মন্দিরের সামনে কেটে গরুর রক্ত ছিটিয়ে দেয় মন্দিরের গায়ে ও বিগ্রহে; গরুটি চার টুকরো করে বাজারের চার দিকে ঝুলিয়ে দেয়। গনিমতে মাল হিসেবে লুঠ করে- স্থানীয় লাখন দেব, মোহন সাহা, গোলক চন্দ্র সাহা, শম্ভুনাথ মুদ্দিতের দোকান ও বসতবাড়ী। স্নান করতে যাওয়ার সময়, গ্রামের বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ গোকুল চন্দ্র ভট্টাচার্যকে পিটিয়ে আধমরা করে প্রকাশ্যে জবাই করে তারা। হিন্দু নির্যাতন এই রকম চরমে পৌঁছলে, তিতুমীরের মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসেন জমিদারের এক ছেলে দেবনাথ রায়। তিতুমীরের সঙ্গে সংঘর্ষে দেবনাথ রায় নিহত হয় ১৮৩১ সালের ৭ নভেম্বর; তাকে মাঠের মাঝখানে হাঁটু গেঁড়ে বসিয়ে পেছনে হাত বেঁধে জবাই ক’রে মুণ্ডুটি ঝুলিয়ে দেয় হয় মাঠের মাঝখানে বাঁশের খুঁটায়। এরপর রামচন্দ্র পুর গ্রামের ব্রাহ্মণ সহ নিম্নবর্ণের হিন্দুদেরকে জোর করে গরুর মাংস খাইয়ে মুসলমান বানানোর চেষ্টা করে তারা। তিতুমীর বাহিনীর এই সব অত্যাচার বন্ধ করতে বসিরহাট থানার তৎকালীন দারোগা রামরাম চক্রবর্তী তিতুমীরের বিরুদ্ধে এ্যাকশনে গেলে, তিতুমীর তাঁকে ধরে মুসলমান হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়; তিনি তৎক্ষণাৎ প্রস্তাব ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করলে, তিতুমীরের নির্দেশে, তিতুমীরের প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুম, দারোগা রামরাম চক্রবর্তীকে কেল্লার বাইরের মাঠে নিয়ে গিয়ে জবাই করে। সেই দিনই লুট করা হয় অসংখ্য হিন্দুবাড়ি, বেশ কজন হিন্দুকে বিবস্ত্র করে মারধর করা হয়। এই সব ঘটনার উল্লেখ আছে 1831 খ্রীষ্টাব্দের ১৬ নভেম্বরের ইন্ডিয়া গেজেটে, কেলভিনের করা এক রিপোর্টের 23 নং অনুচ্ছেদে। তিতুমীরের এই সব সাম্প্রদায়িক জেহাদি কর্মকাণ্ড দমনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় ইংরেজ সরকার। সম্মিলিত ইংরেজ বাহিনীর গোলার আঘাতে ধ্বংস হয় তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা, ৪০ জেহাদিসহ মারা যায় তিতুমির ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ নভেম্বর। ৩৫০ জন ইংরেজদের হাতে বন্দী হয়।
এবার একটু অংকের হিসেবে আসা যাক। বন্দী হওয়া এবং মরা মিলিয়ে কেল্লায় ছিলো মোট ৩৫০+৪০= ৩৯০ বা ধরা যাক ৪০০ জন। কিন্তু উইকিপিডিয়া এবং বাংলা পিডিয়ার ইতিহাসে লেখা রয়েছে, তিতুমীর অনুসারী ছিলো ৫ হাজার এবং তাদের সবাইকে তিতুমীর অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করে। তাহলে বাকি এই ৪৬০০ জন গেলো কোথায় ? এ থেকে প্রমানিত যে, তিতুমীরের অনুসারী ছিলো মোটেই ৪০০ জন। সাধারণ মুসলমানদের উপর যদি হিন্দু জমিদাররা অত্যাচার করতো তাহলে তিতুমীরের দলে মাত্র ৪০০ জন মুসলমান থাকতো না, কমপক্ষে ৪০ হাজার থাকতো; কারণ, চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুর জেলার তৎকালীন আয়তন মোটেই কম ছিলো না, এই তিনজেলা ভেঙ্গে বর্তমান ৭/৮ টি জেলা বানানো হয়েছে যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় একটি বিভাগের সমান। এ থেকে স্পষ্ট যে তিতুমীরের আন্দোলনে সব শ্রেণীর মুসলমানের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিলো না। তিতুমীর তার আদর্শে কিছু লোককে বিপথগামী করতে পেরেছিলো, যার মাশুল তাদেরকে দিতে হয়েছিলো ইংরেজদের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ দিয়ে।
কিন্তু এই তিতুমীর এখন সব বাঙ্গালী মুসলমানের কাছে আদর্শ হয়ে উঠেছে, স্পেশিয়ালি জামাত শিবিরের কাছে। কারণ, বাংলার ইতিহাসে মুসলমানদের সামনে কোনো বীর নেই, কাউকে না কাউকে তো বীর বানাতে হবে, তাই ভিলেন কে হিরো বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেমন সিরাজদ্দৌলা। কিন্তু সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না, তা একদিন না একদিন প্রকাশ হয় ই। বছরের পর বছর ধরে তিতুমীর সম্পর্কে মিথ্যা ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে স্কুল কলেজে, আর এটা পড়াতে গিয়ে হিন্দু জমিদারদের উপর দোষ চাপিয়ে হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মানসিকভাবে ধর্ষণ করা হচ্ছে। মিথ্যার ধারক, বাহক ও প্রচারক, মুসলমানদের কাছ থেকে এছাড়া আর কী ই বা আশা করা যায় ? কিন্ত আপনার যারা এই সত্য ইতিহাস জানলেন, নিজের বাড়ির লোকদেরকে বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ভালো করে বোঝাবেন, যাতে তারা ক্লাসে গিয়েও প্রয়োজনে মুসলিম টিচারদের কাছেও এ বিষয়ে উপযুক্ত প্রশ্ন করে তাদেরকে নাস্তানাবুদ করতে পারে।
জয় হিন্দ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন